নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও পরিবেশ রক্ষায় একমাত্র সহায়
অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ, সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
বিদ্যুৎ খাত জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে বের হতে পারছে না। গ্রিডে প্রায় ৪৩ শতাংশ বিদ্যুৎ আসে গ্যাস থেকে, যদিও এর বড় অংশ এখন আমদানি করা এলএনজি যা আর সস্তা নয়। গ্যাস কমতে শুরু করলে সরকার তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে—ফার্নেস অয়েল ও ডিজেল। শুরুতে ফার্নেস অয়েল সস্তা মনে হলেও পরে ইউনিট প্রতি ১৭ু২০ টাকায় পৌঁছায়। ডিজেল ভিত্তিক বিদ্যুৎ আরও ব্যয়বহুল—৩০ু৩৫ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে যোগ হয় ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের সুবিধা। এমনকি ২০১৮ সালে অপ্রয়োজনীয় একটি বড় ডিজেল কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। যা তিন বছরে খুব সামান্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও বিপুল ক্যাপাসিটি পেমেন্ট দেওয়া হয়েছে। অথচ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ হয়নি। কাগজে কলমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বড় বড় লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে অগ্রগতি ছিল না। বর্তমান সরকার ২০২৩ সালে ২০ শতাংশ ও ২০৪১ সালে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন। নীতিমালাও হয়েছে, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে আশাব্যঞ্জক অগ্রগতি চোখে পড়ে না, বরং বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিলের পর বেসরকারি খাতের ৩৭টি নবায়নযোগ্য প্রকল্পের সম্মতিপত্র বাতিল করা হয়েছে।
১৯৫৭ সালে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দিয়েই দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুরু। দুঃখজনক হলেও সত্য, এরপর দীর্ঘ সময় আমরা আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির পথে এগোতে পারিনি। ২০০৫-০৭ সময়ে দেশে ব্যাপক বিদ্যুৎ ঘাটতি তৈরি হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল। ২০০৮ সাল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে শুরু করে এবং আজ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় পাঁচগুণ বেড়েছে। ২০১২-১৩ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল ২.৫৮ শতাংশ। ঐ সময় থেকে প্রতিবছর দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়তে থাকে। আর উল্টো দিকে ২০১৯-২০ অর্থ বছর পর্যন্ত কমতে থাকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। গত এক যুগে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা বেড়েছে মাত্র ২.১৬ শতাংশ। তবে মহাপরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বারবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০১৬ সালে পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ২০২১ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসবে। সেটি হয়নি পরে ২০২৫ সালের কথা বলা হল। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে এসে দেখা হল, নবায়নযোগ্য উৎস থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হল ৪ শতাংশ।
সরকারের পরিবর্তন হল এবং মনে হয়েছিল এটি একটি বিরাট সুযোগ, কিন্তু দেখা গেল এ সরকারের আমলেই ঘাটতি ৯৪ শতাংশ বেড়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে ১২ টাকার উপরে। এখন আরও স্পষ্ট যে দেশে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু সম্পদ তৈরি হচ্ছে না। টাকা তৈরি হচ্ছে, আর সে টাকা পাচার হচ্ছে। শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, শুধু বিদ্যুৎ খাত থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। যেখানে রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে লুটপাট হয় এবং টাকা পাচার হয় সে অর্থনীতিতে নীতি দর্শন ঠিক থাকলেও মাস্টার প্ল্যান ফেল করতে বাধ্য। আজ বিদ্যুতের দাম যদি ১২ টাকা থাকে আর প্রতিবেশী দেশ থেকে ৮ু৯ টাকায় বিদ্যুৎ আসে, তাহলে এটা নিজেদের বাজারে আমদানির সুযোগ সৃষ্টি ছাড়া আর কী? বিদায়ী সরকার আইডকলের সোলার হোম সিস্টেম ও মিনিগ্রিডের গল্প শুনিয়ে শেষ মুহূর্তে মিনিগ্রিড ন্যাশনালাইজ করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ কেনার কথা বলা হলেও সেই বিদ্যুৎ কোথায় গেল তার কোনো হদিস নেই। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার কথা বললেই বারবার জমির সংকটের কথা বলা হয়। কিন্তু ছাদ ভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিশাল সম্ভাবনা আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। ভিয়েতনাম যেখানে ছাদ ব্যবহার করে হাজার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে সেখানে আমাদের সরকারি ভবনের ছাদে ঘোষিত লক্ষ্যের সামান্য অংশও অর্জিত হয়নি। কিছু অগ্রগতি হয়েছে শিল্প কারখানায় ছাদ ব্যবহার করে। তবুও গতি খুব ধীর। লক্ষ্য আছে, পরিকল্পনা আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ও দৃঢ়তা নেই।
আমাদের ইনস্টিটিউশনগুলো এখনো ফসিল ফুয়েলকেন্দ্রিক। এ কাঠামো দিয়ে এনার্জি ট্রানজিশন সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। বোর্ড, প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ সব জায়গায় ফসিল ফুয়েলের প্রভাব আছে। সংযোগ দেওয়ার দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রতিষ্ঠান সংযোগ দেয় না। কারণ, ফসিল প্ল্যান্ট থেকে তাদের একধরনের আয় আসে। কাগজে ভাল কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। ইপিএসএমপির ভিতরে নীতিতে ভ্রান্তি হয়েছে। টেকনিক্যাল পর্যায়ে কর্মরত জনবলের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, ফলে আগ্রহও নেই। মানবসম্পদ পর্যায় থেকেও বাধা তৈরি হচ্ছে। গত সরকারের সময় সরকারি কর্মকর্তা, বেসরকারি খাত, বিদেশি কোম্পানি ও বিদেশি সরকারের মধ্যে একটি শক্ত নেক্সাস তৈরি হয়েছিল। এমনকি নীতি নির্ধারণী পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে। ভিন্ন দেশগুলো পলিসি প্রণয়নে ঢুকে পড়েছে, যেখানে এলএনজি ও কয়লাকে দিয়ে নবায়নযোগ্য খাত বানানোর চেষ্টা দেখা গেছে। সমাধানের পথে আমাদের ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জিতে জোর দিতে হবে। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও কার্যক্রম সীমিত। সীমিতসংখ্যক জনবল দিয়ে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতিপ্রণয়ন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না। অন্যদিকে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো গ্রহণ বা সমন্বয় হচ্ছে না। শুরুতে বাংলাদেশে সীমিত মেগাওয়াট প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম থাকলেও সরকারি ইউটিলিটি-স্কেল প্রকল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য তুলে ধরে ধীরে ধীরে আস্থা তৈরি করা হচ্ছে। প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই ও মান উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে যাতে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন নিশ্চিত হলে প্রকল্পের অর্থায়ন সম্ভব হয়। স্পষ্ট প্রকল্প পাইপলাইন, আন্তর্জাতিক মানের ভূমি প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি মেগাওয়াট লক্ষ্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে জ্বালানি রূপান্তর প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে হলে এখানে যুক্ত নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ গড়ে তোলা জরুরি। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষের জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যুতের গড় খরচ নিয়ে যে সংখ্যা আমরা দেখি, বাস্তবে তার পেছনে অনেক ব্যয় হিসাবের বাইরে থেকে যায়—গ্রিড অবকাঠামো, আমদানি জ্বালানির করমুক্ত সুবিধা, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি অপচয় ও চুরি—এসব উপাদান বিবেচনায় না রেখে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে ব্যয়বহুল বলা হচ্ছে। প্রযুক্তিগতভাবে সৌর বিদ্যুতের বড় কোনো সীমাবদ্ধতা নেই—রিসাইক্লিং ছাড়া প্রায় সব দিকেই এটি প্রতিযোগিতামূলক ও কার্যকর। তবু নীতিগত জটিলতা, অতিরিক্ত কর এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে। মাঠ পর্যায়ে বিইএসটিআই পরীক্ষাসহ বিভিন্ন অনুমোদনে মাসের পর মাস সময় লাগে। একটি কারখানায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা চার মাসেও সংযোগ পায় না—ফলে বিনিয়োগের সুদ, উৎপাদন ক্ষতি ও অবস্থা সংকট তৈরি হয়। এ বাস্তবতা ব্যবসায়ীদের ধৈর্য ভেঙে দিচ্ছে। নীতিমালা প্রণয়নে অংশীজনের মতামত নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা উপেক্ষিত হয়—ফলে বড় লক্ষ্য ঘোষণা করেও বাস্তবে অগ্রগতি শূন্যের কাছাকাছি থাকে। সরকারেরও লক্ষ্য ২০২৩ সালে ২০ শতাংশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা অর্জন; বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও রোডম্যাপও সেভাবে স্পষ্ট নয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি অনেক কম। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সঠিক ও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে ঋণ পুনর্বিন্যাস করে নবায়নযোগ্য প্রকল্পে ব্যবহার করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা এখানে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বাংলাদেশে ফসিল-ফুয়েল নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য খাতের উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু তার জন্য দরকার স্বচ্ছ নীতিমালা, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের সদ্ব্যবহার, মিডিয়ার স্বাধীন ভূমিকা, স্পষ্ট রোডম্যাপ ও দেশপ্রেমিক উদ্যোগ। নবায়নযোগ্য খাতের জন্য প্রযুক্তি বা টাকা কেবল অংশ মাত্র। গণমাধ্যম ও নীতিপ্রক্রিয়া মিলিয়ে কাজ না করলে বাংলাদেশের ফসিল-ফুয়েল নির্ভরতা কমানো কঠিন। মনে রাখতে হবে বিদ্যুৎ ও কৃষিখাতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দিতে হলেও জাতিকে অগ্রগামী করতে হবে।