ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তবর্তী উপজেলা হরিপুরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নীরবে বদলে দিচ্ছে মানুষের জীবন। “অক্সিজেন” নামের এই সংগঠনটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও সংস্কৃতির সমন্বয়ে একটি টেকসই উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছে। ২০১৭ সালের ২৬ মার্চ মোজাহেদুর ইসলাম ইমনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সংগঠনটি ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জন করেছে।

সংগঠনটির অন্যতম প্রধান কার্যক্রম শিক্ষা খাতে। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত “অক্সিজেন জ্ঞান সমৃদ্ধ কেন্দ্র” বর্তমানে হরিপুরের একমাত্র গণপাঠাগার হিসেবে পরিচিত। এখানে শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত পাঠচক্র, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মক্তব প্রকল্পের মাধ্যমে ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী কোরআন শিক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এছাড়া ২০০০-এর বেশি শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে মেধা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করে মেধাবীদের পুরস্কৃত করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও সংগঠনটির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। “স্বয়ম্ভর” প্রকল্পের আওতায় ১৫ জনকে দোকান, সেলাই মেশিন ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান প্রদান করা হয়েছে, যার ফলে উপকারভোগী পরিবারগুলো এখন নিয়মিত আয় করতে পারছে। এতে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণও বেড়েছে।
স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তায়ও রয়েছে বিস্তৃত কার্যক্রম। সংগঠনটির উদ্যোগে ৪২টি নলকূপ স্থাপন করে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া ২৫০০-এর বেশি অসহায় মানুষের জন্য এক বেলা আহারের ব্যবস্থা, ৩৫০০টির বেশি কম্বল বিতরণ এবং ৩১ জন প্রতিবন্ধীকে হুইলচেয়ার প্রদান করা হয়েছে।
পরিবেশ সংরক্ষণে “মিশন লাল-সবুজ” কর্মসূচির আওতায় বিভিন্ন সড়কে কৃষ্ণচূড়া গাছ রোপণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফলজ ও ভেষজ উদ্যান গড়ে তুলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে লোকস্মৃতি জাদুঘর।

নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সচেতনতায়ও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে সংগঠনটি। বাল্যবিবাহ ও যৌতুক বিরোধী উঠান বৈঠক, স্যানিটারি ন্যাপকিন সচেতনতা এবং নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম ইতোমধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সংগঠনটির কার্যক্রম জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs)-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় পর্যায়ে স্বল্প সম্পদ ব্যবহার করে বৃহৎ প্রভাব সৃষ্টির এই মডেল ইতোমধ্যে প্রশংসিত হয়েছে।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা মোজাহেদুর ইসলাম ইমন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য এমন একটি সমাজ গড়া, যেখানে প্রতিটি মানুষ শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে।”

সব মিলিয়ে, হরিপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু হওয়া ‘অক্সিজেন’ আজ একটি অনুকরণীয় উন্নয়ন মডেল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।