অসম্ভবের বিরুদ্ধে মানুষের অন্তর্গত অভিযাত্রা
খাজা শামীম শাহের ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’ গ্রন্থের পাঠ-সমালোচনা

মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় বাধা অনেক সময় বাইরের পৃথিবী নয়; বরং নিজের ভেতরে জন্ম নেওয়া একটি শব্দ—“পারব না।” আর সেই মানসিক দেয়াল ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহসের নামই আত্মবিশ্বাস। দেশের স্বনামধন্য উদ্যোক্তা, প্রকাশক ও সাংবাদিক এবং প্রমিজ ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা শামীম শাহ তাঁর জীবনমুখী মোটিভেশনাল গ্রন্থ ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’-এ মানুষের সেই অন্তর্নিহিত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার প্রয়াস করেছেন।
গ্রন্থটির সূচিপত্র দেখলেই এর ব্যাপ্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সাতটি পর্বে বিভক্ত বইটিতে মোট ৩৩টি বিষয় আলোচিত হয়েছে। প্রথম পর্ব ‘নিজেকে জয় করার পাঠ’ থেকে শুরু করে দ্বিতীয় পর্বে ‘ব্যক্তিজীবনের সফলতা’, তৃতীয় পর্বে ‘পরিবার ও সমাজ’, চতুর্থ পর্বে ‘পেশা ও নেতৃত্ব’, পঞ্চম পর্বে ‘রাষ্ট্র ও বিশ্ব’, ষষ্ঠ পর্বে ‘আত্মিক সফলতা’ এবং সর্বশেষে ‘উপসংহার—নিজের জীবন-মানচিত্র আঁকুন’।
এই বিন্যাস থেকে স্পষ্ট হয়, লেখক সাফল্যকে শুধু অর্থ, পদ বা খ্যাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং ব্যক্তিমানুষের আত্মজয় থেকে সামাজিক দায়িত্ব এবং আত্মিক উৎকর্ষ পর্যন্ত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শনের কাঠামো নির্মাণ করেছেন।
নিজেকে জয়—সাফল্যের প্রথম শর্ত
গ্রন্থের প্রথম পর্বের বিষয়গুলো—‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’, ‘নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন’, ‘স্বপ্ন দেখার সাহস’, ‘লক্ষ্য নির্ধারণের বিজ্ঞান’ ও ‘সময় ব্যবস্থাপনার কৌশল’—সাফল্যের মূল ভিত্তিগুলোকে সামনে আনে।
এখানে লেখকের মূল বক্তব্য হলো, মানুষের প্রথম বিজয় বাইরের পৃথিবীর ওপর নয়—নিজের ভয়, সংশয় ও আত্ম-অবিশ্বাসের ওপর।
শেকসপিয়রের বিখ্যাত উক্তি—“Our doubts are traitors”—মানুষের সন্দেহই অনেক সময় তাকে সম্ভাব্য সাফল্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
অন্যদিকে হেনরি ফোর্ডের নামে প্রচলিত—“Whether you think you can, or you think you can’t, you’re right”—বক্তব্যটিও মানসিকতার শক্তিকে তুলে ধরে। অর্থাৎ সাফল্যের যাত্রা শুরু হয় আত্মবিশ্বাস থেকে; এরপর প্রয়োজন স্বপ্ন, লক্ষ্য এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার।
ব্যক্তিজীবনের সাফল্য : অভ্যাস থেকে আত্মবিশ্বাস
দ্বিতীয় পর্বে ‘আত্মশৃঙ্খলা ও অভ্যাস’, ‘ইতিবাচক চিন্তার শক্তি’, ‘ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের সিঁড়ি’, ‘ভয়কে জয় করার কৌশল’ এবং ‘আত্মবিশ্বাস গঠনের সূত্র’ আলোচিত হয়েছে। এই অংশে বইটি পাঠককে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়—সাফল্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস ও সিদ্ধান্তের সমষ্টি। ব্যর্থতা এখানে পরাজয় নয়; বরং শিক্ষা। ভয় এখানে থেমে যাওয়ার কারণ নয়; বরং সাহসের পরীক্ষা। আর আত্মবিশ্বাস কোনো কৃত্রিম আত্মপ্রশংসা নয়—এটি প্রস্তুতি, অভিজ্ঞতা ও নিজের ওপর আস্থার ফল।
‘অসম্ভব’কে জয় করার প্রথম বাস্তব পদক্ষেপ তাই নিজের ভেতরের ‘আমি পারি না’কে ‘আমি চেষ্টা করব’-এ রূপান্তর করা।
পরিবার ও সমাজ : একার সাফল্য নয়
তৃতীয় পর্বে ‘আদর্শ পরিবারের ভিত্তি’, ‘সম্পর্কের শক্তি’, ‘সন্তান গঠনের নকশা’, ‘সমাজে নেতৃত্বের ভূমিকা’ এবং ‘মানবকল্যাণ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা’ স্থান পেয়েছে। এখানে বইটির দর্শন ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা অতিক্রম করেছে।
মানুষ যত বড়ই হোক, তার সাফল্যের সঙ্গে পরিবার ও সমাজের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। একটি আদর্শ পরিবার মানুষের চরিত্রের প্রথম বিদ্যালয়। সম্পর্ক তাকে মানসিক শক্তি দেয়, সন্তানকে সঠিকভাবে গড়ে তোলা ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের অংশ এবং মানবকল্যাণ সাফল্যের সামাজিক অর্থকে প্রকাশ করে।
সুতরাং লেখকের সাফল্যদর্শনে “আমি কতটা পেলাম”-এর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে—“আমি কতটা দিতে পারলাম।”
পেশা ও নেতৃত্ব : অর্জন থেকে উৎকর্ষ
চতুর্থ পর্বে রয়েছে ‘কর্মজীবনে উৎকর্ষতা’, ‘ব্যবসায় সাফল্যের সূত্র’, ‘নেতৃত্বের সাতটি স্তম্ভ’, ‘যোগাযোগ দক্ষতা’ ও ‘সংকট মোকাবেলার কৌশল’। লেখকের উদ্যোক্তা-জীবনের অভিজ্ঞতার কারণে এই অংশটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কর্মজীবনে সাফল্য মানে শুধু পদোন্নতি বা অর্থনৈতিক অর্জন নয়; নিজের কাজকে দক্ষতা, সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে করা।
ব্যবসায় সাফল্যের ভিত্তি শুধু মুনাফা নয়—আস্থা, মান, সেবা ও মানুষের প্রয়োজন বোঝার ক্ষমতা।
আর নেতৃত্ব মানে শুধু সামনে দাঁড়ানো নয়; অন্যদেরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। যোগাযোগ দক্ষতা ও সংকট মোকাবেলার ক্ষমতা একজন নেতার প্রকৃত যোগ্যতার পরীক্ষা।
রাষ্ট্র ও বিশ্ব : ব্যক্তি থেকে বিশ্বমানব
পঞ্চম পর্বে ‘দেশপ্রেম ও নাগরিক দায়িত্ব’, ‘রাজনৈতিক সচেতনতা’, ‘বৈশ্বিক নেতৃত্বের শিক্ষা’, ‘আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং ‘মানবতার বিশ্বনাগরিক হওয়া’ আলোচিত হয়েছে। এখানে গ্রন্থের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়েছে। একজন সফল মানুষ শুধু নিজের পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; সে রাষ্ট্র ও বিশ্বেরও অংশ।
দেশপ্রেম শুধু আবেগ নয়—আইন মানা, দায়িত্ব পালন, জনসম্পদ রক্ষা এবং মানুষের অধিকারকে সম্মান করাও দেশপ্রেম।
আধুনিক বিশ্বে আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিও অপরিহার্য। প্রযুক্তি, অর্থনীতি, জলবায়ু ও মানবিক সংকটের যুগে বিশ্বকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যায় না। তাই লেখকের ‘বিশ্বনাগরিক’ হওয়ার আহ্বান মানবিকতার বৃহত্তর দর্শনকে সামনে আনে।
আত্মিক সফলতা : সাফল্যের চূড়ান্ত প্রশ্ন
ষষ্ঠ পর্বে রয়েছে ‘আত্মউন্নতির পথ’, ‘ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতা’, ‘আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব’, ‘নৈতিকতা ও চরিত্র’, ‘সফলতার চূড়ান্ত অর্থ’, ‘সফল হওয়ার জন্য করণীয়’ এবং ‘আমি পারবো’। এই অংশটি বইটির দর্শনকে পূর্ণতা দিয়েছে। কারণ অর্থ, পদ, ক্ষমতা ও খ্যাতি অর্জন করেও যদি মানুষের ভেতরে শান্তি না থাকে, তবে সেই সাফল্য কতটা পূর্ণ?
এই পর্ব পাঠককে তাই সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নটির সামনে দাঁড় করায়—সফলতা আসলে কী?
বড় হওয়া মানে কি শুধু সম্পদ অর্জন? নাকি ভালো মানুষ হওয়াও সাফল্যের অংশ?
নৈতিকতা ও চরিত্রের গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। প্রতিভা মানুষকে ওপরে তুলতে পারে, কিন্তু চরিত্র তাকে সেই উচ্চতায় টিকিয়ে রাখে।
শেষে ‘আমি পারবো’—এই বাক্যটি যেন পুরো গ্রন্থের দর্শনের পরিণত উচ্চারণ। ‘অসম্ভব’ নিয়ে মনীষীদের ভাবনা
‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’ ভাবনাটি শুধু এই গ্রন্থের নয়; মানবসভ্যতার দীর্ঘ সংগ্রামেরও একটি সার্বজনীন দর্শন।
অড্রে হেপবার্নের নামে বহুল প্রচলিত উক্তি—“Nothing is impossible, the word itself says, ‘I’m possible!’”—অসম্ভব শব্দের মধ্যেও সম্ভাবনার কাব্যিক উপস্থিতি খুঁজে পায়।
নেলসন ম্যান্ডেলার নামে বহুল প্রচলিত আরেকটি উক্তি—“It always seems impossible until it’s done.”—কোনো কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগে তার কঠিনতা কতটা প্রবল মনে হয়, তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই ভাবনাগুলো খাজা শামীম শাহের গ্রন্থের মূল বক্তব্যের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ তৈরি করে। ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি এর বিষয়গত বিস্তার ও ধারাবাহিকতা। আত্মজয় থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবন, পরিবার, সমাজ, পেশা, নেতৃত্ব, রাষ্ট্র, বিশ্ব এবং আত্মিক সাফল্য—মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা রয়েছে। তবে ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’ বাক্যটিকে আক্ষরিক অর্থে নয়, মানবসম্ভাবনার দৃষ্টিতে পড়াই অধিক যুক্তিযুক্ত। কারণ পৃথিবীতে বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে। সবকিছু সম্ভব নয়; কিন্তু অনেক কিছুই সম্ভব হয়ে উঠতে পারে, যদি মানুষ চেষ্টা, জ্ঞান, পরিকল্পনা, অধ্যবসায় ও সঠিক নেতৃত্বকে একত্র করতে পারে। এই বাস্তবতাই বইটির প্রেরণাকে আরও অর্থবহ করে।
শেষকথা
‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’ শুধু একটি মোটিভেশনাল বই নয়; এটি মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথনের একটি প্রয়াস। বইটি যেন পাঠককে ধাপে ধাপে বলে—
নিজেকে বিশ্বাস করো।
স্বপ্ন দেখো।
লক্ষ্য নির্ধারণ করো।
সময়কে সম্মান করো।
আত্মশৃঙ্খলা গড়ে তোলো।
ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নাও।
ভয়কে জয় করো।
পরিবারকে ভালোবাসো।
সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হও।
কর্মে উৎকর্ষ অর্জন করো।
নেতৃত্বে মানবিক হও।
রাষ্ট্র ও বিশ্ব সম্পর্কে সচেতন হও।
নৈতিকতা ও চরিত্রকে অটুট রাখো।
তারপর নিজের জীবন-মানচিত্র নিজেকেই আঁকো—যে আহ্বানটি বইটির উপসংহারেও প্রতিফলিত হয়েছে।
অতএব, ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই’ মূলত অসম্ভবকে অস্বীকার করার বই নয়; অসম্ভবের সামনে মানুষকে নতুন করে দাঁড় করানোর বই।
একটি ভালো বই তখনই সফল হয়, যখন তার পৃষ্ঠার কোনো একটি বাক্য পাঠকের জীবনের কোনো একটি মুহূর্তে আলো জ্বালাতে পারে।
এই গ্রন্থের সেই আলোকিত বাক্যটি হতে পারে—
“অসম্ভব বলে কিছু নেই—আমি পারবো।”
লেখক: মো: ইমাম হোসাইন
ট্রাস্টি চেয়ারম্যান, পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশ।
কান্ট্রি এডিটর, এশিয়ান স্টেট ইন্টা: জার্নাল।
imam.uic2016@gmail.com